ঢাকা, রবিবার, ২৮ নভেম্বর ২০২১ | ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ | ২৩ রবিউস সানি ১৪৪৩

বিনা ধান-১৭ চাষে লাভবান পাবনার চাষিরা

বিনা ধান-১৭ চাষে লাভবান পাবনার চাষিরা

ছবি: গ্লোবাল টিভি

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পাবনা : বিনা ধান-১৭ আগাম পাকে, লাভ অনেক বেশি। বিনাধান-১৭ চাষে লাভবান হওয়া পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার দক্ষিণ নারিচা গ্রামে চাষিরা এ কথা জানিয়েছেন। শস্য নিবিড়তা বাড়াতে এ ধান খুবই কার্যকর বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা)-এর কৃষি বিজ্ঞানীরা। লবণাক্ত এলাকা ছাড়া সমতল ভূমির পাশাপাশি পাহাড়ী এলাকাতেও বিনাধান-১৭ চাষ করা সম্ভব বলে তাঁরা জানিয়েছেন 

বিনা উপকেন্দ্র, ঈশ্বরদীর উদ্যোগে এবং ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি অফিসারের সহযোগিতায় ঈশ্বরদীর দক্ষিণ নারিচা গ্রামে বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) কর্তৃক উদ্ভাবিত উচ্চ ফলনশীল আমন ধানের জাত বিনাধান-১৭-এর প্রচার ও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে সম্প্রতি মাঠদিবস অনুষ্ঠিত হয়। এ মাঠদিবসে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিনার পরিচালক (গবেষণা) ড. মো: আব্দুল মালেক এবং মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (গবেষণা সমন্বয়ক) ড. মো: মুনজুরুল ইসলাম, পাবনা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এর উপপরিচালক মোঃ আব্দুল কাদের এবং বিনা উপকেন্দ্র, ঈশ্বরদীর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুশান চৌহান। এতে সভাপতিত্ব করেন বিনা উপকেন্দ্র ঈশ্বরদীর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন। সঞ্চালনায় ছিলেন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কামরুন নাহার।  

বাংলাদেশ ফারমার্স এসাসিয়েশন ( বিএফএ)-এর কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং ঈশ্বরদীর খ্যাতিমান চাষি  শাহজাহান আলী বাদশা জানান, ধান চাষিরা বিনাধান-১৭ চাষ করে বিঘায় শুকনো আমন পেয়েছেন গড়ে ২১ মণেরও বেশি। অন্যান্য জাতের আমন সাধারণত বিঘা প্রতি পাওয়া যায় ১৫/১৬ মন। আমন চাষে বিঘায় খরচ হয় জাত ভেদে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। আর বিনাধান-১৭ চাষে বিঘায় খরচ হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। আর পানি ও সারের খরচ কমে এলাকাভেদে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কম লাগে। এ কারণে এ ধান কৃষক বান্ধব। 

স্থানীয় চাষিদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,  বিনাধান-১৭ অক্টোবরের মধ্যে কাটা-মাড়াই শেষ হয় বলেই আলু এবং সরিষা চাষ করা যায় প্রায় একমাস আগেই। 

বিনা উপকেন্দ্র ঈশ্বরদীর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা কৃষিবিদ সুশান চৌহান জানান, উচ্চ ফলনশীল এ ধান ভালভাবে শুকালে ৬ থেকে ৮ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব। লবণাক্ত এলাকা ছাড়া সমতল ভূমির পাশাপাশি পাহাড়ী এলাকাতেও বিনা ধান-১৭ চাষ করা যায়। তিনি জানান, এ ধানের মুড়িও অনেক ভাল হয়। তিনি আরও জানান, এ ধানের ভাতে খনিজ অ্যামাইলোজের পরিমাণ প্রায় ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ধান পাতাপোড়া, খোল পচাঁ, ও কা-পচাঁ রোগ প্রতিরোধে সক্ষম আর বাদামী ঘাসফড়িং, গলমাছি ও পামরী পোকার আক্রমণ প্রতিরোধের ক্ষমতা অনেক বেশি। 

বিনা উপকেন্দ্র ঈশ্বরদীর ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ মারুফ হোসেন জানান, এ জাতের ধানগাছ খাটো ও শক্ত বলে হেলে পড়ে না। পূর্ণবয়স্ক গাছের উচ্চতা ৯৬ থেকে ৯৮ সেন্টিমিটার। পাতা গাঢ় সবুজ ও খাড়া। ধান আগাম পেকে যাওয়ায় কাটার পর জমিতে সহজেই আলু, গম বা রবিশস্য চাষ করা যায়।

পাবনা জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর-এর উপপরিচালক মোঃ আব্দুল কাদের বলেন, লবণাক্ত এলাকা ছাড়া দেশের সব রোপা আমন অঞ্চল, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা এবং রাজশাহীসহ ঢাকা, কুমিল্লা, যশোর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও পার্বত্য অঞ্চলে জাতটির বেশি ফলন পাওয়া যায়।

বিনার পরিচালক (গবেষণা) ড. মো: আব্দুল মালেক জানান, ধান চাষ বৃদ্ধির কারণে তেল ও ডালজাতীয় শস্যের জমি কমে যাচ্ছে। বিনা ধান-১৭ উচ্চ ফলনশীল এবং এর জীবনকাল তুলনামূলকভাবে অনেক কম বলে শস্য নিবিড়তা বাড়াতে খুবই কার্যকর। আগাম পাকা জাত হিসেবে এটি চাষ করে সঠিক সময়ে তেল ও ডাল ফসল চাষ সম্ভব।

বিনার মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (গবেষণা সমন্বয়ক) ড. মো: মুনজুরুল ইসলাম বলেন, এ জাতে ইউরিয়া সার এক-তৃতীয়াংশ কম প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া ৫০ শতাংশ সেচের অর্থ সাশ্রয় হয়। ধানটি চিকন ও ভাত খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ভালো দাম পান কৃষক। এ ছাড়া অ-মৌসুমে ধান কাটায় গোখাদ্য হিসেবে খড়ের সরবরাহ বাড়বে, এতে ভালো দামে খড় বিক্রিও করা যাবে। পাঁচ শতাংশ বীজতলায় ১০ কেজি বীজ ফেলতে হবে। জুন মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুলাইয়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ (আষাঢ়ের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শেষ সপ্তাহ) পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করে ২০ থেকে ২৫ দিনের চারা রোপণ করলে ভালো ফসল পাওয়া যায়। তবে, জুলাইয়ের শেষ (শ্রাবণের দ্বিতীয়) সপ্তাহ পর্যন্তও বীজতলা করা যায়।

এ ধানের উদ্ভাবক ও বিনার মহাপরিচালক ড. মির্জা মোফাজ্জল ইসলাম বলেন, বিনা ধান-১৭ উজ্জ্বল রঙের। ধান ও চাল লম্বা এবং চিকন, খেতে সুস্বাদু। এ কারণে বাজারমূল্য বেশি ও বিদেশে রপ্তানির উপযোগী। চালে অ্যামাইলোজের পরিমাণ ২৪.৬ শতাংশ এবং হেক্টরপ্রতি ৬.৮ টন থেকে সর্বোচ্চ আট টন পর্যন্ত ফলন হয়। এ ধান গাছের প্রতিটি শিষে পুষ্ট দানার সংখ্যা ২৫০ থেকে ২৭০টি। প্রচলিত জাতের তুলনায় ইউরিয়া সার ৩০ শতাংশ কম এবং জমিতে ৪০ শতাংশ পানি কম লাগে। এ কারণে ‘গ্রিন সুপার রাইস’ হিসেবেও জাতটির নামকরণ হয়েছে। 

তিনি জানান,এ জাতের ধানটি উদ্ভাবনে পাঁচ বছর গবেষণা করা হয়েছে। ধানগাছের প্রতিটি শিষে পুষ্ট দানার সংখ্যা ২৫০ থেকে ২৭০টি। প্রচলিত জাতের তুলনায় ইউরিয়া সার ৩০ শতাংশ কম ও জমিতে ৪০ শতাংশ পানি কম লাগে। তিনি বলেন, ‘এ জাতে ইউরিয়া সার এক-তৃতীয়াংশ কম প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া ৫০ শতাংশ সেচের অর্থ সাশ্রয় হয়। ধানটি চিকন ও ভাত খেতে সুস্বাদু হওয়ায় ভালো দাম পান কৃষক। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ জাত আবাদ করে লাভবান হচ্ছেন কৃষক। এখন সারা দেশে জাতটি ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

এএইচ