ঢাকা, বুধবার, ৩০ নভেম্বর ২০২২ | ১৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ | ৬ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আজ কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত হয়

আজ কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত হয়

ছবিঃ: সংগৃহীত

কাজী সাইফুল, কুষ্টিয়া: ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ কুষ্টিয়া ইসলামিয়া কলেজ মাঠে স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের জনসভায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়ায়  তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলা স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক ও তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল জলিল। 

২৩ মার্চ কুষ্টিয়া হাইস্কুল মাঠে পুনরায় স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করে পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য (এমপিএ) গোলাম কিবরিয়া ও আব্দুর রউফ চৌধুরী সেদিন তারা জয়বাংলা বাহিনীর অভিবাদনও গ্রহণ করেন। একই সাথে চলতে থাকে যুদ্ধের প্রস্তুতি। 

কুষ্টিয়ার প্রতিটি গ্রামে জয়বাংলা বাহিনী গঠিত হয়। এরমধ্যে ২৫ মার্চ রাতে ২৭ বেলুচ রেজিমেন্টের ‘ডি’ এক কোম্পানি সৈন্য এসে কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন, জেলা স্কুল, থানা, আড়ুয়াপাড়াস্থ ওয়ারলেস অফিস ও টেলিগ্রাফ অফিস দখলে নিয়ে শহরে কারফিউ জারি করে। এরপর পুরো শহর দখলে নিয়ে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন জ্বালাও-পোড়াও আরম্ভ করে
পাকিস্তানি বাহিনী। এদের প্রতিশোধ করতে স্থানীয় যুবক রনি রহমান সহযোদ্ধাদের নিয়ে হাতবোমা তৈরি করেন। তিনি খবর জানতে পারেন পাকিস্তানিরা নবাব সিরাজউদ্দৌলা সড়ক দিয়ে যাতায়াত করে। তাদের আক্রমণ করতে পরদিন ২৭ মার্চ নিজামতুল্লাহ সংসদের ছাদে উঠে বোমা নিয়ে তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন।  এ সময় পাকিস্তানি আর্মিরা বোমা নিক্ষেপে উদ্যত রনি রহমানকে দেখে গুলি ছোড়ে। আর্মিদের একটি গুলি তার মাথায় বিদ্ধ হলে ঘটনাস্থলেই তিনি শহীদ হন। কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধে রনিই প্রথম শহীদ হন।

তবে মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী কুষ্টিয়ায় চরম প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ৩০ মার্চ ভোরে বাংলার দামাল ছেলেরা কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে পাকিস্তানি হানাদার ক্যাম্পে হামলা চালান। এ যুদ্ধে নিহত হয় অসংখ্য পাকিস্তানি সেনা। এরপর বংশীতলা, দুর্বাচারা, আড়পাড়া, মঠবাড়িয়া, মিরপুরের কাকিলাদহ, কুমারখালীর কুশলিবাসা, করিমপুর, ঘাসখালসহ কুষ্টিয়া জেলায় ছোট বড় মিলিয়ে মোট ৪৪টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ১ এপ্রিল পাকিস্তানি বাহিনী কুষ্টিয়া ছেড়ে পালিয়ে যায়। সেদিন প্রথমবারের মতো মুক্ত হয় কুষ্টিয়া। পরবর্তী সময়ে ১০ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন হয়। এরপর থেকে দফায় দফায় বিমান হামলা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। তারা আবারও কুষ্টিয়া দখলে নিয়ে বাঙালি নিধন আর গণহত্যার উৎসবে মেতে ওঠে। তবে ৬ ডিসেম্বর তিন দিক থেকে মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার বিভিন্ন এলাকা হানাদার মুক্ত হতে থাকে। 

৯ ডিসেম্বর মধ্যে কুষ্টিয়া শহর ছাড়া অন্যান্য এলাকা শত্রুমুক্ত হয়ে যায়। তবে তুমুল যুদ্ধ চলে কুষ্টিয়ায়। অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সাহসী তরুণ মুক্তিযোদ্ধারা  যুদ্ধ করে ১১ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া শহরকে শত্রুমুক্ত করেন। 

১১ ডিসেম্বর চারিদিকে কুষ্টিয়া হানাদার মুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষ কুষ্টিয়া শহরে ছুটে আসেন। সেদিন ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে স্লোগানে কুষ্টিয়ার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। এই দিন মুক্তিযোদ্ধারা শূন্যে রাইফেলের গুলি ফুটিয়ে উল্লাস করতে থাকে।


কুষ্টিয়া জেলায় মোট ৪৪টি যুদ্ধ হয়। এর মধ্যে ৩৩টি ক্যাজুয়ালি যুদ্ধ। কুষ্টিয়া সদরে ৮টি, কুমারখালীতে ৬টি, দৌলতপুরে ১৯টি, মিরপুরে ৮টি, ভেড়ামারায় ২টি এবং খোকসা উপজেলায় ১টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কুষ্টিয়ার মুক্তিযুদ্ধে প্রায় শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। আহত হন প্রায় আড়াই শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা। এছাড়াও গণহত্যার শিকার হন প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ। 

কুষ্টিয়া জেলায় ১০জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বীর উত্তম দুজন, বীর বিক্রম একজন ও বীর প্রতীক সাত জন। 

এএইচ