ব্যাপকমাত্রায় জ্বালানি আমদানির কারণে বাংলাদেশে ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বাণিজ্য ঘাটতি হচ্ছে। ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে এই ঘাটতি আরও বৃদ্ধি পেতে পারে সতর্ক করেছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এমবার। সংকট কাটাতে দ্রুত সাশ্রয়ী ও টেকসই সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম-সিভিএফ ও ভি-২০-এর সহযোগিতায় প্রকাশিত ‘দ্যা ইলেকট্রিক ফাস্ট-ট্র্যাক ফর ইমার্জিং মার্কেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশসহ বিশ্বের জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জ্বালানি আমদানি ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৫৫ বিলিয়ন ডলার। ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে চলতি বছর এই ব্যয় আরও ৩০ বিলিয়ন ডলার বেশি হতে পারে। গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ অর্ধেকের বেশি দেশ সৌরবিদ্যুত ব্যবহারের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলেছে। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম বাংলাদেশ। দেশটিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখনো মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার মাত্র ৩ শতাংশ। যা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট থেকে বাংলাদেশকে সুরক্ষা দিতে পারছে না বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম জাকির হোসাইন খান বলেন, বাংলাদেশে জ্বালানি ও খাদ্যের দাম বৃদ্ধি এরই মধ্যে পরিবার ও জাতীয় অর্থনীতিকে চাপে ফেলছে। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর (এলডিসি) পরিবারগুলো বছরে ৮৮ ডলার বন্যা মোকাবিলার জন্য সঞ্চয় করতো। কিন্তু এখন জ্বালানি ও খাদ্যের দাম ৪০ শতাংশ বৃদ্ধিতে সেই অর্থ ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশকে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। সে কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার অন্তত ৫০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি করার এখন অপরিহার্য সময়।
প্রতিবেদন বলছে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে রূপান্তর সরকারি তথ্যের চেয়ে অনেক দ্রুত ঘটছে। সিভিএফের সদস্য প্রায় ৪৬ শতাংশ দেশ এরই মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। ১০টির মধ্যে ৮টি দেশে সৌর প্যানেল আমদানি সরকারি স্থাপনার তথ্যের তুলনায় অন্তত তিনগুণ বেশি—যা ইঙ্গিত দেয় যে পরিবার ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিকেন্দ্রীকৃত সৌর ব্যবস্থার দ্রুত বিস্তার ঘটছে। অন্যদিকে, গত এক দশকে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি ও বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতিসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির দাম ৩০ থেকে ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে, যা এসব প্রযুক্তিকে আরও সহজলভ্য করে তুলেছে।
জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক ব্যবস্থার বিপরীতে, যেখানে বৃহৎ অবকাঠামো ও উচ্চ প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রয়োজন, সেখানে সৌর ও ব্যাটারি প্রযুক্তি ধাপে ধাপে স্থাপন করা যায়। ফলে বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি বিশেষভাবে উপযোগী, যেখানে জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ। প্রতিবেদন অনুযায়ী এই পদ্ধতির প্রধান সুবিধাগুলো হলো— জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কম প্রাথমিক বিনিয়োগ। গ্রিড সম্প্রসারণ ছাড়াই দ্রুত বিদ্যুৎপ্রাপ্তি। আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বৃদ্ধি। বৈশ্বিক মূল্য অস্থিরতার বিপরীতে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যন্ত ও সেবাবঞ্চিত এলাকায় জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণের চেয়ে বিকেন্দ্রীকৃত সৌরব্যবস্থা এরই মধ্যে বেশি সাশ্রয়ী প্রমাণিত হয়েছে।
ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যানশিয়াল অ্যানালাইসিস-আইইইএফএর বাংলাদেশ বিষয়ক প্রধান জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম বলেন, অতীতে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশকে অস্থির আন্তর্জাতিক বাজার ও ভর্তুকির চাপের মুখে ফেলেছে। ফলে ঘনঘন ভূরাজনৈতিক সংকটের সময়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিশেষত সৌরশক্তি—জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে কার্যকর সমাধান হতে পারে। বেসরকারি খাতে এরই মধ্যে ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পের পাইপলাইনও আশাব্যঞ্জক।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর ভবিষ্যতে আবদ্ধ নয়। বরং কম খরচের প্রযুক্তি ব্যবহার করে সরাসরি পরিচ্ছন্ন জ্বালানিনির্ভর ব্যবস্থায় রূপান্তরের সুযোগ রয়েছে। এতে শুধু জ্বালানি প্রবেশাধিকারই বাড়বে না, বরং শিল্প উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয় কমানো, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার যখন অনিশ্চয়তায় ভুগছে, তখন সৌরভিত্তিক বিদ্যুতায়নের দিকে দ্রুত অগ্রসর হওয়া কেবল পরিবেশগত প্রয়োজনই নয়, বরং বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য এটি অর্থনৈতিক অপরিহার্যতা। —এজেড