জুনে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ প্রাণহানি, নিহতদের মধ্যে ৫৬ শিশু ও ৪৪ নারী
সদ্য বিদায়ী জুন মাসে সারাদেশে ৪৭২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত এবং ৫৬১ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৫৬ জন শিশু এবং ৪৪ জন নারী রয়েছেন। রোববার (৫ জুলাই) বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘রোড সেফটি ফাউন্ডেশন’ ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি অনলাইন নিউজ পোর্টাল, বিভিন্ন ইলেকট্রনিক মিডিয়া ও নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা এক প্রতিবেদনে এই পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিদায়ী মাসে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার হার ও প্রাণহানি সবচেয়ে বেশি ছিল। ১৪৫টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যা মোট নিহতের ৩০.৫৯%। এছাড়া সড়ক দুর্ঘটনায় ৯১ জন পথচারী (২০.৭৭%) এবং যানবাহনের চালক ও সহকারী ৫৭ জন (প্রায় ১৩%) নিহত হয়েছেন।
অন্যান্য যানবাহনের মধ্যে বাসের যাত্রী ২৭ জন (৬.১৬%), ট্রাক-কাভার্ডভ্যান-পিকআপ-টলি আরোহী ৩৭ জন (৮.৪৪%), প্রাইভেটকার-মাইক্রোবাস-অ্যাম্বুলেন্স আরোহী ১৪ জন (৩.১৯%), থ্রি-হুইলার (ইজিবাইক-সিএনজি-অটোরিকশা-অটোভ্যান-মিশুক) যাত্রী ১১২ জন (২৫.৫৭%), স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন (নসিমন-ভটভটি-টমটম-মাহিন্দ্র) যাত্রী ১৫ জন (৩.৪২%) এবং রিকশা-বাইসাইকেল আরোহী ৮ জন (১.৮২%) নিহত হয়েছেন।
এছাড়া একই সময়ে ৯টি নৌ দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ৪ জন আহত এবং ২১টি রেল ট্র্যাক দুর্ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৭ জন আহত হয়েছেন।
দুর্ঘটনার ধরন ও স্থানভিত্তিক বিশ্লেষণ
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে:
জাতীয় মহাসড়কে: ১৫১টি (৩২%)
আঞ্চলিক সড়কে: ১৯৪টি (৪১.১০%)
গ্রামীণ সড়কে: ৬৪টি (১৩.৫৫%)
শহরের সড়কে: ৫৭টি (১২.০৭%)
অন্যান্য স্থানে: ৬টি (১.২৭%)
এর মধ্যে মুখোমুখি সংঘর্ষের কারণে ১০৯টি (২৩.০৯%), নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ২০৬টি (৪৩.৬৪%), পথচারীকে চাপা বা ধাক্কা দেওয়ায় ৯৭টি (২০.৫৫%), যানবাহনের পেছনে ধাক্কা দেওয়ায় ৫৩টি (১১.২২%) এবং অন্যান্য কারণে ৭টি (১.৪৮%) দুর্ঘটনা ঘটেছে।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে ঢাকা বিভাগে সবচেয়ে বেশি (১১৬টি) দুর্ঘটনায় ১১৮ জন নিহত হয়েছেন (দুর্ঘটনার হার ২৪.৫৭%, প্রাণহানি ২৬.৯৪%)। অন্যদিকে ময়মনসিংহ বিভাগে সবচেয়ে কম (১৯টি) দুর্ঘটনায় ১৬ জন নিহত হয়েছেন (দুর্ঘটনার হার ৪.০২%, প্রাণহানি ৩.৬৫%)। শুধু রাজধানী ঢাকায় ৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত এবং ৪৯ জন আহত হয়েছেন।
অন্যান্য বিভাগের চিত্র:
চট্টগ্রাম: ২৩.৭২% দুর্ঘটনায় ২৫.৭৯% প্রাণহানি।
রাজশাহী: ১৮.৪৩% দুর্ঘটনায় ১৭.৫৭% প্রাণহানি।
রংপুর: ১০.১৬% দুর্ঘটনায় ৮% প্রাণহানি।
খুলনা: ৮.৬৮% দুর্ঘটনায় ৮.৬৭% প্রাণহানি।
বরিশাল: ৫.৯৩% দুর্ঘটনায় ৫.০২% প্রাণহানি।
সিলেট: ৪.৪৪% দুর্ঘটনায় ৪.৩৩% প্রাণহানি।
ফাউন্ডেশনের মতে, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া গতি, চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা, অদক্ষতা ও শারীরিক-মানসিক অসুস্থতা, নির্দিষ্ট বেতন ও কর্মঘণ্টা না থাকা, মহাসড়কে স্বল্পগতির যানবাহন চলাচল, তরুণদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানো, ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার প্রবণতা, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার ঘাটতি এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিই এসব দুর্ঘটনার মূল কারণ।
নিরাপদ সড়কের জন্য ১২টি সুপারিশ
এই পরিস্থিতি উত্তরণে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন ১২টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করেছে:
১. জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল (NRSC) পুনর্গঠন করে এর অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা করা এবং কাউন্সিলের হাতে আইন ও নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা দেওয়া।
২. বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএর প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং শীর্ষ পদে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দেওয়া।
৩. মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা।
৪. সড়ক থেকে মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন প্রত্যাহার করা।
৫. রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে কোম্পানিভিত্তিক আধুনিক বাস সার্ভিস চালু করা।
৬. বিআরটিসির বাসের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সেবা উন্নত করে সরকারের পরিবহন সক্ষমতা বাড়ানো।
৭. দক্ষ চালক তৈরির প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নিয়ে তাদের বেতন, কর্মঘণ্টা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
৮. স্বল্পগতির ছোট যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণসহ নিরাপদ রোড ডিজাইন করা।
৯. সব রেল ক্রসিংয়ে গেইট-কিপার নিয়োগ করা।
১০. সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা ও দক্ষতা বাড়াতে জাতীয় বাজেটে অর্থ বরাদ্দ করা।
১১. প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা।
১২. টেকসই পরিবহন কৌশলের অধীনে সড়ক, রেল ও নৌ-পরিবহন একত্রিত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন করা।
সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, সময়োপযোগী নীতিমালা, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং শিক্ষার মাধ্যমে নিরাপদ সড়ক গড়ে তোলা সম্ভব, তবে এর জন্য সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি।