মালয়েশিয়া ও চীন সফরে কী অর্জন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান?
গত ফেব্রুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর, গত ২১ থেকে ২৬শে জুন মালয়েশিয়া ও চীন সফর ছিল বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম বিদেশ সফর। তাঁর এই দ্বিপক্ষীয় সফরকে 'অভূতপূর্ব সাফল্য' হিসেবে উল্লেখ করে শনিবার বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে একটি ধন্যবাদ প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।
সংসদে প্রস্তাবটি উত্থাপনের সময় স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সফরকালে চীনের সঙ্গে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়া দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতির ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
জবাবে সংসদ সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আমাদেরকে দায়িত্ব দিয়েছে তাদের স্বার্থ দেখার জন্য। আমি যে কাজটি করার চেষ্টা করেছি, আমার অবস্থান থেকে আমার দেশের মানুষের স্বার্থ নিয়ে কথা বলা ও সেই স্বার্থ রক্ষা করার চেষ্টা করেছি। যদি ভালো কিছু অর্জন হয়, এটি বাংলাদেশের অর্জন। এ সফরে দেশের মানুষের কোনো অর্জন হলে সেটি দেশের মানুষের অর্জন।
প্রধানমন্ত্রীর এই হাই-প্রোফাইল সফরের আগে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা এবং চীনের সাথে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জনপরিসরে ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছিল।
মালয়েশিয়া সফরের মূল অর্জনসমূহ
মালয়েশিয়া সফরের শেষ পর্যায়ে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের সময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই জানিয়েছিলেন যে তিনি দেশটিতে আরো বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ, অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণ, সেখানে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের স্বদেশে ফেরত পাঠানো এবং একই সঙ্গে যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়ে অনুরোধ করেছেন।
এছাড়াও, দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে নয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা পর্যায়ে সহযোগিতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সেমিকন্ডাক্টর খাতে অংশীদারিত্ব জোরদার করার পাশাপাশি ‘বৈশ্বিক ইসলামি অর্থনীতি’র সম্ভাবনাকে বিবেচনায় নিয়ে ‘হালাল শিল্পে’ সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী একমত হয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের বিষয়ে সরকারি বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত একটি বিশেষ অর্থনৈতিক করিডর করার প্রস্তাব দিয়েছে বেইজিং।
বৈঠকের পর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, চীন বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন এবং মোংলা বন্দরকে আরো বেশি প্রোগ্রেসিভ, আপগ্রেড ও সার্ভিস ওরিয়েন্টেড করার জন্য গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই সফর ও বৈঠকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হিসেবে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ও ৪টি অতিরিক্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এছাড়া, দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনার ভিত্তিতে ১৬ দফার একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়েছে, যেখানে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ রূপরেখা ও বড় সিদ্ধান্তগুলো জায়গা পেয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের বিদ্যমান বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা, বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং চীনের শিল্প স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে।
তিস্তা প্রকল্প ও ‘টু প্লাস টু’ কৌশলগত সংলাপ
দুই দেশের যৌথ ঘোষণায় বাংলাদেশের তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সহায়তা এবং দুই দেশের মধ্যে পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা খাতে 'টু প্লাস টু' কৌশলগত সংলাপ চালুর মতো বিষয়টি বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। যদিও এই সফরের আগে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং যুদ্ধবিমান বা সামরিক সরঞ্জাম কেনার বিষয়টি জনপরিসরে আলোচনায় এলেও, এসব বিষয়ে সরাসরি কোনো চুক্তি বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়নি।
তবে যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, চীন তার সক্ষমতা অনুযায়ী 'তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে' (টিআরসিএমআরপি) সহায়তা করবে। পাশাপাশি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের কাজ এগিয়ে নিতে সহযোগিতা দেবে।
মুখপাত্র মাহদী আমিন এই বিষয়টিকে ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বলেন, ফরেন এবং ডিফেন্স এই দুটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে 'ফর দ্য ফার্স্ট টাইম' বাংলাদেশের সাথে চায়নার 'টু প্লাস টু' একটা আন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কাজ চলছে বলেও তিনি জানান।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের দুই বছরের 'অস্থির সময়' পাড়ি দিয়ে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের পর, মালয়েশিয়া ও চীনের সর্বোচ্চ নেতাদের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই বৈঠকগুলোই বাংলাদেশের জন্য বড় স্বস্তির বিষয়।
চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সি ফয়েজ আহমদ গণমাধ্যমকে বলেন, শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠকটাই একটা বড় অর্জন। এতে করে দেশ দুটির সাথে সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হলো। দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল, এ সফর এটি নিশ্চিত করেছে যে চীন ও বাংলাদেশ একযোগে কাজ করবে।
অন্যদিকে, ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. ফরিদ হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফরে যেসব অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে সেগুলো অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে চীনের সাথে যেসব বিষয়ে কথাবার্তা হয়েছে, সেগুলোর কিছু বিষয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতের যে উদ্বেগ রয়েছে, সেটিকে বাংলাদেশ কূটনৈতিকভাবে কীভাবে ডিল করে, সেটাও দেখার বিষয় হবে। মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে এবং অনিয়মিত শ্রমিকদের নিয়মিতকরণে প্রকৃত অগ্রগতি হলে সফরটির স্থায়ী অর্জন নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি, চীনের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনাই হবে নতুন সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। -সূত্র: বিবিসি বাংলা
-এসএফ