১৭ লাখ শিশুর শৈশব যখন বন্দি শ্রমে!
যেই বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন খাতা-কলম আর খেলার সামগ্রী, সেই বয়সে হাতুড়ি আর ভারী যন্ত্রাংশ সামলাচ্ছে দেশের লাখো লাখো শিশু! শত চেষ্টা আর আইনি পদক্ষেপের পরও কোনোভাবেই যেনো অবসান ঘটানো যাচ্ছে না এই নির্মম বাস্তবতার।
রামপুরায় তরুণকে গু'লিস'হ দুজনকে হ'ত্যা মা'মলার রায় | Global TV News
আজ (২৯ জুন) সোমবার ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষ্যে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় উঠে এসেছে দেশের শিশুশ্রমের এক হাড়হিম করা চিত্র।
সরকার ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা বা আইএলও-এর যৌথ নতুন প্রতিবেদনে জানা গেছে, বাংলাদেশে এখনো ১৭ লাখ ৮০ হাজার শিশু কোনো না কোনো শ্রমের সাথে সরাসরি যুক্ত। এর চেয়েও ভয়াবহ তথ্য হলো, এর মধ্যে ১০ লাখ ৭০ হাজার শিশুই কাজ করছে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে, যা প্রতিনিয়ত তাদের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
- বিভাগীয় শীর্ষে চট্টগ্রাম, জেলায় কুড়িগ্রাম
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিভাগীয় পর্যায়ে শিশুশ্রমের এই হার সবচেয়ে বেশি চট্টগ্রাম বিভাগে, যেখানে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার শিশু শ্রমে নিয়োজিত। এর ঠিক পরেই ৩ লাখ ৪০ হাজার শিশু নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। তবে দেশের জেলাগুলোর মধ্যে এককভাবে কুড়িগ্রাম জেলায় শিশু শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। আর পুরো দেশের এই মোট শিশু শ্রমিকের মধ্যে ছেলের সংখ্যাই বেশি, প্রায় ১৩ লাখ ৭০ হাজার এবং মেয়ের সংখ্যা ৪ লাখ।
- তিনটি প্রধান খাতে খাটছে শিশুরা
প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিশুরা প্রধানত তিনটি খাতে সবচেয়ে বেশি খাটছে, শিল্প, সেবা ও কৃষি। এর মধ্যে শিল্প খাতে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৯০ হাজার, সেবা খাতে ৫ লাখ ৬০ হাজার এবং কৃষি খাতে ৪ লাখ ২০ হাজার শিশু নিয়োজিত। সরকার ইতোমধ্যেই ৪৩টি কাজকে শিশুদের জন্য ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। যার মধ্যে রয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ও কাচ কারখানা, অটোমোবাইল ওয়ার্কশপ, ইট ভাঙা, ওয়েল্ডিং, জাহাজভাঙা শিল্প এবং আবর্জনা ব্যবস্থাপনার মতো চরম বিপজ্জনক কাজগুলো।
- কাগজে কঠোর আইন, প্রয়োগে দুর্বলতা
অথচ, ২০২৬ সালে সংশোধিত বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ অনুযায়ী, কাজে যোগদানের সর্বনিম্ন বয়স ১৪ বছর। এই আইন অমান্য করে কোনো শিশু বা কিশোরকে কাজে নিয়োগ দিলে, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিককে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। এমনকি কোনো অভিভাবক যদি শিশুকে কাজে দেওয়ার জন্য কোনো অবৈধ চুক্তিতে লিপ্ত হন, তবে তার জন্যও ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে আইন ও নীতিমালার দুর্বল বাস্তবায়ন, চরম দারিদ্র্য এবং প্রাথমিক বা মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার কারণে এই আইনটি বাস্তবে খুব কমই কার্যকর হতে দেখা যায়।
- লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ বিশ্ব
জাতিসংঘ ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম সম্পূর্ণ নির্মূলের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও, ২০২৬ সালের এই বর্তমান বৈশ্বিক রিপোর্ট বলছে, সেই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব হয়নি। এখনো বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শ্রমের অন্ধকার চক্রে বন্দি।
- শুরু করতে হবে নিজের ঘর থেকে
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, "শিশুশ্রম নির্মূলের কাজ শুরু হতে হবে নিজের ঘর থেকে। শুধু সেমিনারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তবসম্মত ও টেকসই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশ থেকে শিশুশ্রম দূর করতে হবে।
একই সাথে আগামী এক বছরের মধ্যে একটি কার্যকর পাইলট প্রোগ্রাম ডিজাইন করে কত শতাংশ শিশুকে শ্রম থেকে ফিরিয়ে এনে শিক্ষা নিশ্চিত করা গেলো, তার বাস্তব প্রমাণ দেখানোর জন্য তিনি কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশ দেন। এছাড়াও দেশব্যাপী ব্যাপক গণসচেতনতা তৈরির জন্য প্রতিটি মসজিদ, মন্দির, গির্জা ও বৌদ্ধবিহারের মতো ধর্মীয় উপাসনালয়গুলোকে খুতবা বা ধর্মীয় সভার মাধ্যমে কাজে লাগানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
- বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ
২০৩০ সালের মধ্যে শিশুশ্রমমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে, দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করার জোর আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
-এজেড