এক/এগারোর কথা বললে আমার এ অঞ্চলের (সরকারদলীয় এমপিদের) অনেকেই বিব্রতবোধ করবেন বলে দাবি করে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এমপি বলেছেন, সামনের লোকেরা (বিরোধী দল) বিব্রতবোধ করবে কি না জানি না। এক/এগারোর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলাম আমি গয়েশ্বর চন্দ্র রায় সর্বপ্রথম। যখন সংস্কারের ট্যাবলেট বিক্রি করা শুরু করেছিল বিহারি আমিন (মেজর জেনারেল আমিন), যখন সংস্কারের ট্যাবলেট বিক্রি শুরু করেছিল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল বারী। ফখরুদ্দীন-মঈনউদ্দীনের বিরাজনীতিকরণ চক্রান্ত (যখন শুরু হয়)। এক/এগারোর সময়েআমাদের অনেক বড় বড় নেতা ভয়ে, ভীত হয়ে দলে দলে একসঙ্গে খালেদা জিয়াকে পরিত্যাগ করলেন, তার ডাকে সাড়া দিলেন না। তৃণমূলের নেতাকর্মী ও দেশবাসী সাড়া জোগালো খালেদা জিয়াকে। খালেদা জিয়াও চ্যালেঞ্জ নিয়ে দেশত্যাগ করেননি। তিনি জেলে গেছেন। এক/এগারোর সময়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জন্য জামায়াত বিবৃতি দেয়নি, তখন তারা বলেছিল তারেক রহমান-খালেদা জিয়ার অপকর্মের দায় জামায়াত নেবে না। কিন্তু যুদ্ধাপরাধীর মামলায় জামায়াত নেতারা গ্রেফতার হলে বিএনপির তৎকালীন চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বিবৃতি দিয়েছিলেন ও এক পর্যায়ে মুক্তিও চেয়েছিলেন। তবে একাত্তরের কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াতকে ভুল স্বীকার করার জন্য অনুরোধ করেন গয়েশ্বর।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
দেশের সমসাময়িক রাজনীতি ও প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, বাংলাদেশ সবার সঙ্গে অর্থনৈতিক কারণে বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব কখনোই দাসত্বের নামান্তর হবে না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে সমমর্যাদার ভিত্তিতে, জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে নয়। প্রতিবেশীর সঙ্গে বন্ধুত্ব হবে কিন্তু তা কখনোই ‘স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের’ মতো হওয়া উচিত নয়। স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বজায় রাখাই হবে আমাদের মূল অগ্রাধিকার। দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হলেও প্রকৃত মুক্তি এখনো আসেনি। জলবায়ু ও রাজনৈতিক ভাবনার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নতুন প্রজন্মের যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমানকে ধারণ করেই পূরণ করতে হবে।
শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শনের স্মৃতিচারণ করে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, জিয়াউর রহমান চাটুকারিতা পছন্দ করতেন না এবং বিশ্বাস করতেন যে সমালোচনা হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জিয়াউর রহমান যখন যুদ্ধের ডাক দিয়েছিলেন, তখন তিনি জাতিকে আত্মরক্ষার নয় বরং পাক হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। অথচ সেই উত্তাল সময়ে অনেক বড় বড় নেতাকে যুদ্ধের পরিবর্তে কেবল সাবধানে থাকার নির্দেশনা দিতে দেখা গেছে।বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই শহীদ জিয়ার সেই অবদানকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে চায় না।
খালেদা জিয়ার আপসহীন নেতৃত্বের প্রশংসা করে গয়েশ্বর রায় বলেন, ওবায়দুল কাদের একদিন খালেদা জিয়াকে ক্ষমা চাইতে বলেছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের কাছে তিনি আজ ‘মাদার অব ডেমোক্রেসি’ হিসেবে স্বীকৃত। গণতন্ত্রের প্রশ্নে তিনি কখনোই মাথা নত করেননি। ১/১১-র সময়কার ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তৎকালীন বিরাজনীতিকরণের মুখে অনেক নেতা যখন দল ত্যাগ করেছিলেন, তখন তৃণমূলের নেতা-কর্মীরাই খালেদা জিয়ার শক্তি হয়েছিলেন। তিনি জেল খেটেছেন কিন্তু দেশত্যাগ করেননি। জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন নেতৃত্বের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি জানান, বিপদের দিনে তারা বিএনপির পাশে দাঁড়াতে অস্বীকৃতি জানালেও খালেদা জিয়া সবসময়ই তাদের বিচারের স্বচ্ছতার দাবি তুলে উদারতা দেখিয়েছেন।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান প্রসঙ্গে বিএনপির এই নেতা বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন যখন শুরু হয়, তখন তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি দ্রুততম সময়ে এই আন্দোলনকে নৈতিক ও সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এটি কোনো একক দলের অর্জন নয়, বরং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরী এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের সব স্তরের মানুষের সম্মিলিত ত্যাগের ফসল। যারা আজ সংসদে আছেন তাদের পাশাপাশি অসংখ্য সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক কর্মী এই ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশের জন্য লড়াই করেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান ভূ-রাজনীতির তুলনা করে তিনি বলেন, ১৯৪৭-এর দেশভাগ থেকে শুরু করে ৫২-র ভাষা আন্দোলন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, সবকিছুর মূলে ছিল বঞ্চনা ও শোষণ থেকে মুক্তি। অথচ আজও বিদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমরা জাতীয় মর্যাদা সমুন্নত রাখতে পারছি না। অনেক ক্ষেত্রে আন্তরিকতার অভাব ও রাজনৈতিক নতজানু নীতির কারণে আমরা জাতীয় লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হচ্ছি। আমরা অতীতকে ভুলে থাকব না, কিন্তু বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোই আমাদের বড় চ্যালেঞ্জ।c -এজেড