বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান | ছবি : সংগৃহীত
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেছেন, খালেদা জিয়া দেশ-বিদেশের কোনো অপশক্তির সামনে কখনো মাথা নত করেননি। যারা তাঁকে জেলে পাঠিয়েছে, যারা তাঁকে গৃহহীন করেছে, তারা রান্না করা খাবার খেতে পারেনি, পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ফ্যাসিবাদী হাসিনার ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মিথ্যা মামলায় ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দুই বছরের বেশি সময় অন্ধকার কারাগারে আবদ্ধ থাকার সময় উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে দেশনেত্রী দারুণভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পুরো দেশবাসী সাক্ষী, পায়ে হেঁটে তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু নির্জন কারাগার থেকে তিনি বের হলেন চরম অসুস্থতা নিয়ে। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের মতে, পরবর্তী সময়ে গৃহবন্দীতে চার বছর তাঁকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ না দেওয়ার কারণেই তাঁর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে হলো এই অপরাজেয় নেত্রীর। তাই এই মৃত্যুর দায় থেকে ফ্যাসিবাদ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবে না।
তিনি আর বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার মতো জনপ্রিয়তার দৃষ্টান্ত শুধু বাংলাদেশে নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও বিরল। তিনি ছিলেন এমন এক নেতা, যিনি প্রতিকূলতা, দমন-পীড়ন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মধ্যেও জনগণের ভালোবাসা ও আস্থা অটুট রাখতে পেরেছেন। বেগম খালেদা জিয়া তিনবার দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন জনগণের সরাসরি ভোটে। প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনে তিনি একাধিক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সবকটিতেই বিজয়ী হয়েছেন, যা তাঁর প্রতি জনগণের গভীর আস্থার প্রমাণ। এমন জনপ্রিয়তা কেবল বাংলাদেশেই নয়, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিরল ঘটনা।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেল ৩টায় রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা লাখ লাখ মানুষের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজা সম্পন্ন হয়। জানাজার শুরুতে খালেদা জিয়ার স্মৃতিচারণ করে দেওয়া বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। জানাজায় ইমামতি করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, খালেদা জিয়ার বড় ছেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, প্রধান বিচারপতি, তিন বাহিনীর প্রধান, দেশি-বিদেশি রাজনীতিক, কূটনৈতিক ব্যক্তি ছাড়াও লাখ লাখ মানুষ জানাজায় অংশ নেন। দেশের ইতিহাসে এটাই সর্ববৃহৎ জানাজা বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জাতীয় সংসদ ভবনের মাঠ, মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে শুরু করে বিজয় সরণি, আগারগাঁও, পুরাতন বাণিজ্য মেলার মাঠ, আসাদগেট, আড়ং মোড়, মিরপুর রোড, সোবহানবাগ, ফার্মগেট, কারওয়ান বাজার জাহাঙ্গীরগেট এলাকা থেকে জানাজায় অংশ নেন মানুষ। রাস্তায় মানুষের জনস্রোত থাকায় এসব এলাকার ভবনগুলোর ছাদেও লোকজনকে জানাজার নামাজ আদায় করতে দেখা গেছে। খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে আজ সকাল থেকে লাখো মানুষের ঢল নামে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে। জনস্রোত ছড়িয়ে পড়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের বাইরেও। শুধু তাই নয়, উড়ালসড়কও বন্ধ হয় জনস্রোতে।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ক্ষমতাসীন কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকা উভয় অবস্থাতেই বেগম খালেদা জিয়া জনগণের পাশে থেকেছেন। ক্ষমতার মোহ তাঁকে কখনো আপসের পথে নিতে পারেনি। দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে তিনি ছিলেন আপসহীন। কোনো দেশি বা বিদেশি অপশক্তির সামনে তিনি কখনো মাথা নত করেননি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বেগম খালেদা জিয়া স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৯১ সালে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। গণতন্ত্রের প্রতি তাঁর এই অঙ্গীকারের কারণেই দেশ-বিদেশের গণতন্ত্রকামী মানুষ তাঁকে ‘গণতন্ত্রের মাতা’ হিসেবে সম্মান জানিয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম এবং মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী। নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তিনি একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর শাসনামলে নারী শিক্ষার প্রসারে উপবৃত্তি কর্মসূচি, শিক্ষার জন্য খাদ্য কর্মসূচি, মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবাসীদের কল্যাণে পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনসহ বহু যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। দেশনেত্রীর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক দক্ষতায় ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা তাঁকে বারবার হয়রানি করেছে। মিথ্যা মামলায় কারারুদ্ধ করা, গৃহহীন করা এমনকি চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করা হয়েছিল। তবুও তিনি কখনো আদর্শচ্যুত হননি, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের প্রশ্নে আপস করেননি। ২০১৮ সালের পর কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বকালে উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতরভাবে অবনতি ঘটে। দেশ-বিদেশের চিকিৎসকরাও একমত যে সময়মতো চিকিৎসা পেলে তাঁর জীবন আরো দীর্ঘ হতে পারতো। কিন্তু সব কষ্ট সহ্য করেও তিনি ছিলেন অটল ও দৃঢ়চেতা।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, আজ দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা, নেতৃত্ব, সাহস ও ত্যাগের ইতিহাস চিরকাল অম্লান থাকবে। তিনি যে ভালোবাসা পেয়েছেন দেশের মানুষের কাছ থেকে, তা ইতিহাসে বিরল। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের জন্য তাঁর জীবন ও কর্ম এক অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শনকে ধারণ করে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি গণতন্ত্র, শান্তি, উন্নয়ন ও জনগণের কল্যাণের পথে এগিয়ে যাবে।