ঢাকা, বুধবার, ২৯ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | ১১ জ্বিলকদ ১৪৪৭

শিরোনাম

সংসদে আইনমন্ত্রী

গুমে জড়িত কোনো অপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে পারবে না

গুমে জড়িত কোনো অপরাধী আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে পারবে না

সংসদে গুম বিষয়ে আবেগতাড়িত বক্তব্য প্রদান এবং গুম অধ্যাদেশ বাতিলের সুপারিশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় জামায়াতের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাসেমের (আরমান) প্রতি সহমর্মিতা ও সমবেদনা জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক দিয়ে বের হতে পারবে না। এ বিষয়ে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী আইন প্রণয়নে সরকার কাজ করছে। গুমের শিকার ব্যক্তিরা শুধু একটি পরিবারের সদস্য নন, তারা সমগ্র জাতিরই অংশ। তারা আমার ভাই, আমার স্বজন, আমার সহকর্মী—বাংলাদেশের মানুষ। তাদের প্রতি অন্যায় কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

রোববার (৫ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের বক্তব্যের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।

এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম বলেন, গত সরকারের সময় বহু মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন এবং অনেকেই আর ফিরে আসেননি। আমি সেই অন্ধকার স্থান থেকে ফিরে এসেছি, যেখানে আমার মতো আরও শত শত মানুষকে নেওয়া হয়েছিল। এক পর্যায়ে তিনি ভেবেছিলেন তাকে হত্যা করা হবে এবং সেই সময় তিনি সূরা ইয়াসিন পাঠ শুরু করেন। পরে কিছু সাহসী তরুণের উদ্যোগে তিনি জীবিত ফিরে আসার সুযোগ পান বলে উল্লেখ করেন। গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার কমিশন সংক্রান্ত আইন বাতিলের সুপারিশে বিস্ময় প্রকাশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা রোধে প্রণীত আইন কেন বাতিলের কথা বলা হচ্ছে।

স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ব্যারিস্টার আরমান আমার ভাই, আমার স্বজন এবং সহকর্মী। তিনি দীর্ঘ সময় গুমের শিকার হয়েছিলেন। বাংলাদেশে তার মতো ৭০০-এর বেশি মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন, যাদের মধ্যে আমাদের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যেভাবে গুমের শিকার হয়েছিলেন এবং মৃত্যুর প্রহর গুনেছিলেন, তাকে যেভাবে পার্শ্ববর্তী দেশে ফেলে আসা হয়েছিল এবং যেভাবে তিনি বিচারের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশে ফিরে এসেছেন, তাতে মনে করার কোনো কারণ নেই যে, গুমের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারবে।

বিরোধীদলের আপত্তির মুখে আইনমন্ত্রী ব্যাখ্যা দেন, মানবাধিকার কমিশন আইন এবং গুম প্রতিরোধ সংক্রান্ত অধ্যাদেশটি যেভাবে প্রণয়ন করা হয়েছে, তা বহাল রাখলে গুমের শিকার ব্যক্তিদের প্রতি অবিচার করা হতে পারে। আমরা একইসঙ্গে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে ‘ক্রাইম এগেইনস্ট হিউম্যানিটি’ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞায় গুমকে অন্তর্ভুক্ত করেছি। সেখানে তদন্ত ও বিচার হবে এবং অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।

অন্যদিকে, বর্তমান অধ্যাদেশে গুমের সাজা সর্বোচ্চ ১০ বছর রাখা হয়েছে উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, অধ্যাদেশে বর্ণিত মানবাধিকার কমিশন আইনের তদন্ত প্রক্রিয়ায় যে সময়সীমা দেওয়া হয়েছে, তাতে ভুক্তভোগীরা আরও হয়রানির শিকার হতে পারেন। এ কারণেই বিশেষ কমিটিতে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ব্যারিস্টার আরমান হয়তো সেখানে উপস্থিত না থাকায় প্রকৃত তথ্যটি জানতে পারেননি। সরকার আইন দুটিকে আরও যুগোপযোগী, জনকল্যাণমুখী এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। এই অধিবেশনের মাঝামাঝি সময়ে বা পরবর্তীতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নতুন বিল আনা হবে, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই পার না পায়। গুম আইনের সাজার বিধান, তদন্ত পদ্ধতি এবং আইসিটি অ্যাক্টের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিধানের মধ্যে যাতে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা তৈরি না হয়, সেজন্য আইনগুলো যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ব্যারিস্টার আরমানসহ গুমের ভুক্তভোগীদের প্রতিনিধি হিসেবে রাখা হবে এবং তাদের মতামত নেওয়া হবে।

আলোচনার একপর্যায়ে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন বলেন, সংসদে এমন কঠোর আইন প্রণয়ন করা উচিত, যাতে ভবিষ্যতে আর কোনো নাগরিক গুম বা হত্যার শিকার না হন। আশ্বাস দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, সব ধরনের অসঙ্গতি দূর করে একটি সমন্বিত ও কার্যকর আইন প্রণয়ন করা হবে, যা গুমের মতো গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।

—এজেড