অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থা ও আর্থিক শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে বিএনপির রাজনৈতিক অবস্থান কোনো ধরনের আপসের সুযোগ দেয় না। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, অতীতে যখনই বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তখন আর্থিক শৃঙ্খলা, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা কিংবা শেয়ারবাজার নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। তাই নিশ্চিন্ত থাকুন ...।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে এনসিপিরদক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাতের (হাসনাত আবদুল্লাহ) সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৮তম দিনে সংসদ অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দলটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, বিএনপির শাসনামলে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বা শেয়ারবাজারে অনিয়ম নিয়ে কোনো উদ্বেগ ছিল না। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। যারা ব্যাংক থেকে অর্থ নিয়ে পালিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং আইনি প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি রিকভারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। অর্থ উদ্ধারের জন্য আমরা উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি রিকভারি প্রতিষ্ঠানগুলোও কাজ করছে। আগামী দিনগুলোতে এই অর্থ সফলভাবে উদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে।
জাতীয় সংসদে বর্তমান সরকারের ব্যাংকঋণ গ্রহণের লাগামহীন গতি এবং রাজস্ব আদায়ের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করে সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা বলেছেন, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনের মাথায় ব্যাংকব্যবস্থা থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। সরকারের দ্রুত ঋণ বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরে বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
সম্পূরক প্রশ্নে রুমিন ফারহানা বলেন, নতুন সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার পরিমাণ ক্রমাগতই বাড়ছে। ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৫২ দিনে ব্যাংক থেকে ৪৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছে বর্তমান সরকার। সরকারের দ্রুতঋণ বৃদ্ধির কারণে ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরে বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। এবার বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। সেখানে চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত সরকার ঋণ নিয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০৮ শতাংশ। এর মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেওয়া ঋণ ৬৮ হাজার ২২৯ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য পাওয়া গেছে। অপরদিকে রাজস্ব আদায় অর্থবছরে আট মাসে লক্ষ্যমাত্রা থেকে পিছিয়ে আছে প্রায় ৭৫১ হাজার কোটি টাকা। মন্ত্রী মহোদয়ের কাছে আমার প্রশ্ন আমরা রাজস্ব বাড়ানোর ক্ষেত্রে এবার নতুন কোনও পরিকল্পনা নিচ্ছি কিনা, করের আওতা বাড়ানো হচ্ছে কিনা এবং হলে সেটি কীভাবে?
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমরা কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র দুই মাসের মতো সরকারে এসছি। সুতরাং এটা ক্যারিওভার হচ্ছে আগে থেকে। সুতরাং এই সংখ্যাটা এখানে প্রযোজ্য না। বিএনপির যে অর্থনৈতিক পলিসি সেটা হচ্ছে— স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ কমিয়ে আনা। আমি নিশ্চিতভাবে আপনাদের বলতে চাই— আগামী বাজেটে তার পরবর্তী সময়ে আপনারা দেখতে পাবেন সরকার স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ কীভাবে কমিয়ে আনছি। ক্রমান্বয়ে এর প্রতিফলন আপনারা আগামী দিনে দেখতে পাবেন। এই বাজেটেও দেখতে পাবেন। সরকার বিগত দিনের অনেক লায়াবিলিটি গ্রহণ করেছে, যেখানে ব্যবসায়ীরা এক্সিস্টেনশিয়াল থ্রেটে আছে। ব্যাংকের রিপেমেন্ট করতে পারছে না। তার স্টাফদের বেতন দিতে পারছে না। ফ্যাকটরিগুলো রিডান্ডেড হয়ে যাচ্ছে। যেটা আমরা রেখে এসেছিলাম অনেক ওপরে। সেটা বিগত সরকারগুলো কমিয়ে কমিয়ে নিচে নামিয়ে এনেছে। আমরা যেখানে রেখে আসছিলাম, ওখানে তুলতে হলে সময় দিতে হবে। বিএনপি সরকার সেই কাজটা ভালোভাবে সম্পন্ন করবে— আমি আপনাকে নিশ্চিতভাবে বলতে পারি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের তারকা চিহ্নিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য এবং এর রপ্তানি সম্প্রসারণের বিষয়টি সরকার বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষির সার্বিক উন্নয়নে ‘বরেন্দ্র প্রকল্প’ পুনরায় চালু, যথাযথভাবে আম সংরক্ষণের জন্য ‘বিশেষ হিমাগার’ স্থাপন, বিশেষায়িত কৃষিপণ্য রপ্তানি অঞ্চল গড়ে তোলা ও কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আম রপ্তানি বাড়াতে শুধু ‘হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট’ স্থাপনই যথেষ্ট নয়। এর সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণ, গ্রেডিং, পরীক্ষাগার ও সার্টিফিকেশন, নিরাপদ পরিবহন, বাজার সংযোগ, ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক স্যানিটারি ও ফাইটোস্যানিটারি (এসপিএস) মানদণ্ড পূরণের সমন্বিত ব্যবস্থা প্রয়োজন। এ কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা দপ্তর থেকে অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক ও কারিগরি দিক থেকে গ্রহণযোগ্য প্রকল্প প্রস্তাব পাওয়া গেলে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, মাননিয়ন্ত্রণ সুবিধা, সংরক্ষণ অবকাঠামো এবং রপ্তানি-সহায়ক সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা বা বাজেট সহায়তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রকল্পের বাস্তবতা, সম্ভাব্য রপ্তানি আয়, কৃষকের ন্যায্যমূল্য, স্থানীয় কর্মসংস্থান, আঞ্চলিক ভ্যালু-চেইন উন্নয়ন এবং সম্পদের প্রাপ্যতা বিবেচনায় নেওয়া হবে। তবে, সরকার বিষয়টি নীতিগতভাবে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছে।নূরুল ইসলামের অপর এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, আম ছাড়াও ওই অঞ্চলের যে কৃষিভিত্তিক সফলতা এবং এটার সম্ভাবনা বিবেচনায় আমরা পুরো অঞ্চলের একটি ইকোনমিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছি। যেখানে গ্রোথ সেন্টারগুলো থাকবে, যেখানে এগ্রিকালচার সেক্টর ভালো, সেখানে হিমাগার থেকে শুরু করে অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ সকল সুযোগ-সুবিধা সম্ভাবনা যাচাই করে আগামী বাজেট এবং বাজেট পরবর্তী পরিকল্পনায় সামগ্রিকভাবে বিবেচনা করছি।
নোয়াখালী-৫ আসনের সরকারি দলীয় সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফখরুল ইসলামের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, সরকার বাজেটীয় পদক্ষেপ এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করতে এবং বেসরকারি খাতের পুনরুদ্ধারে সহায়তা করার পরিকল্পনা করছে। এটি একটি বড় ঘাটতি এবং রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। তবে সময় ও সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে অর্থনীতি আবার গতি ফিরে পাবে বলে আমরা আশাবাদী। বর্তমানে বাংলাদেশের আর্থিক খাত একটি বড় ধরনের পুঁজি ঘাটতির মুখে রয়েছে, যা দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান— উভয়ই পুঁজির সংকটে ভুগছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাতীয় মুদ্রার ৪০ শতাংশের বেশি অবমূল্যায়ন, পাশাপাশি ইউটিলিটি ও পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি খাতের ব্যবসায় প্রায় ৫০ শতাংশ পুঁজি ঘাটতি তৈরি হয়েছে। অতীতে অবৈধভাবে পুঁজি পাচারের কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা খাতটিতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ইতোমধ্যে পুঁজি পুনঃসংযোজনের পদক্ষেপ নিয়েছে এবং আগামী বাজেটগুলোতেও এ খাতে বরাদ্দ অব্যাহত রাখা হবে। ব্যাংক খাত পুনঃমূলধনীকরণে সরকার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে, বিশেষ করে আইএমএফ-এর সঙ্গে কাজ করছে। এছাড়া, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে স্থিতিশীলতা ও তারল্য ফিরিয়ে আনা যায়। অতীতের নানা অনিয়ম— যেমন ঋণ ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা ও আর্থিক খাতে অসদাচরণের সংকটকে আরো তীব্র করেছে। পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ব্যাপক ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রাপ্তি সীমিত হয়ে পড়েছিল।
—এজেড