আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, আমরা এমন আইনজীবী চাই যারা বাংলাদেশের জন্য অবদান রাখতে পারেন। আমরা চাই ‘যার নেই কোন গতি সে করে উকালতি’- এই ধারণা থেকে মানুষকে বের করে আনতে। আমরা এই (আইন) পেশার মান উন্নত করতে চাই।
সোমবার (১৩ এপ্রিল) সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিস (এজিও) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) উদ্যোগে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের সমাবর্তন এবং পরিচিতি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম শেষ করা প্রথম ব্যচের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৫ শিক্ষার্থীকে সনদ প্রদান ও নতুন ব্যাচের শিক্ষার্থীদের শপথ পাঠ করানো হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমি পরশুদিন পত্রিকায় দেখলাম বাংলাদেশের একজন সিনিয়র জাজ ছিলেন , উনি উকালতিতে ফিরে এসেছেন। মক্কেলের কাছ থেকে সোয়া কোটি টাকা নিয়েছেন রায় লিখে দেওয়ার জন্য। তাও টাকাটা চেকে নিয়েছেন উনার নামে। মক্কেলকে রায় নিয়ে দিতে পারেননি। টাকাও ফেরত দেননি। মক্কেল সম্ভবত সুপ্রিম কোর্ট বারে অভিযোগ করেছেন। আমরা এরকম আইনজীবী চাই না। এরকম নীতি কথা বলার আইনজীবী চাই না। আমরা চাই এমন আইনজীবী যারা বাংলাদেশকে কন্ট্রিবিউট করতে পারেন।
বার কাউন্সিল পরীক্ষায় বিদ্যমান ‘বৈষম্যের’ কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বার কাউন্সিল পরীক্ষাতে একটা ডিসপ্যারিটি (অসমতা) আছে, আমি এনরোলমেন্ট কমিটির মেম্বার হিসেবে দেখেছি। আমাদের অনেক মেধাবী ছেলেরা যারা ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ে এসেছে, যারা বিদেশে লেখাপড়া করেছে, তাদের একটা কঠিন বাস্তবতা পার হতে হয়। বার কাউন্সিলের চেয়ারম্যান সাহেব আছেন, বার কাউন্সিলের সদস্য আছেন এখানে। উনাদের অনুরোধ করব, এই বিষয়গুলো আপনারা একটু ভালো করে খতিয়ে দেখবেন; কীভাবে এটাকে আরো বেশি যুগোপযোগী করা যায়।
সংসদীয় কার্যক্রমে তরুণ আইনজীবীদের সম্পৃক্ত করার উদ্যোগের কথা জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আমি ইতিমধ্যেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছি, সংসদ সদস্যদের জন্য একজন করে ইন্টার্ন দেওয়া যায় কি না বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এই ইন্টার্নরা সংসদ সদস্যদের রিসার্চ ওয়ার্কগুলো করে দেবেন পর্যায়ক্রমিকভাবে। এখান থেকে দুটি লাভ হবে, একটি হল আইন প্রণয়নের সঙ্গে তারা সম্পৃক্ত হতে পারবেন, কীভাবে আইন প্রণয়ন হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, কীভাবে রাজনীতিকে, রাজনৈতিক পরিবেশকে একটি সুস্থ, পরিশীলিত এবং যুক্তিতর্কের জায়গায় আনা যায়, এরকম একটি জায়গা হয়ত আমরা তৈরি করতে পারব।
অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের অবকাঠামো সংকট নিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসে বসার জায়গা নাই। খুব কষ্ট হয় আমাদের সহকর্মী ও সাবেক কলিগদের বসার জন্য। এটাকে আরও কীভাবে আধুনিকায়ন করা যায়, সে মর্মে আমি ইতিমধ্যেই বাজেটে অন্তর্ভুক্তির জন্য আমার অফিসকে নির্দেশ দিয়েছি; যাতে বাজেটে এই খাতে কিছু বরাদ্দ দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত নবীনদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, আপনাদের পেশাদার জীবনের ভিত্তি সর্বদা তিনটি জিনিসের উপর দাঁড় করান উচিত। সংবিধান, পেশাদার আচরণবিধি এবং অটল সততা। আপনারা এমন সব মুহূর্তের সম্মুখীন হবেন, যেখানে সহজ পথটি প্রলুব্ধ করবে। আমি আপনাদের অনুরোধ করব, কখনোই ন্যায়বিচারের সঙ্গে আপস করবেন না। এজি অফিস ও ইউএনডিপির এই যৌথ উদ্যোগ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি নিদর্শন। প্রথম ব্যাচের ইন্টার্নরা সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী, পঞ্চদশ সংশোধনীর আপিল এবং অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক মামলাগুলো সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ পেয়েছেন।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল বলেন, ন্যায়বিচার ও আইনি উৎকর্ষের অগ্রগতির জন্য জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো একসাথে কাজ করলে কি অর্জন হয় এই কর্মসূচিটি তার একটি প্রমাণ। সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা এগুলোই একজন আইনজীবীর বিশ্বাসযোগ্যতার মূল ভিত্তি। একটি দেশের বিচার ব্যবস্থার শক্তি কেবল প্রতিষ্ঠানগুলোর উপরই নির্ভর করে না, বরং এর মধ্যে যারা কাজ করেন তাদের চরিত্র এবং যোগ্যতার উপরও নির্ভর করে। আমাদের আগামী প্রজন্ম সাংবিধানিকতা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচারের আদর্শকে এগিয়ে নিয়ে যাবে সে প্রত্যাশা করছি।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন এমপি, বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের রাষ্ট্রদূত নিকোলাস লাইনাস র্যাগনার উইকস। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ, আব্দুল জব্বার ভুঁইয়া, ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রাম কোর্ডিনেটর ও ডেপুটি অ্যাটর্নি ব্যারিস্টার তাসনুভা শেলীসহ ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলরা।
—এজেড