সারা দেশে চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেছেন, পরীক্ষার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে সরকার সন্তুষ্ট এবং শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের কাছ থেকেও ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে সেশনজট কমাতে ডিসেম্বরের মধ্যেই সব পাবলিক পরীক্ষা শেষ করে জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
রোববার (২৬ এপ্রিল) বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনে ‘বিশ্ব মেধাস্বত্ব দিবস ২০২৬’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক কর্মশালার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এসব কথা বলেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুর কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ। এছাড়াও এসময় ইউজিসির অন্যান্য সদস্য, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, আইকিউএসি সেলের পরিচালক, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রশ্নফাঁস সংক্রান্ত গুজব ছড়ানো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, যাচাই ছাড়া কোনো তথ্য প্রচার না করতে গণমাধ্যমের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে গুজব ছড়ানো হলেও তা যাচাই না করে প্রচার করলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুজব কে ছড়াচ্ছে, সেটি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যাচাই ছাড়া তা প্রচার করা আরও বড় সমস্যা। একটি সংবাদ প্রকাশের আগে সেটির সত্যতা যাচাই করা গণমাধ্যমের দায়িত্ব। ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো তথ্য অনেক সময় ‘ইনস্ট্যান্ট’ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। গুজব রোধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, যারা গুজব ছড়াচ্ছে কিংবা যাচাই ছাড়া প্রচার করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে।
এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আশ্বস্ত করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সরকার সুন্দর ও সুষ্ঠু পরিবেশে পরীক্ষা আয়োজনের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। এখন পর্যন্ত পরীক্ষার সার্বিক পরিস্থিতিতে আমি সন্তুষ্ট। অভিভাবক, শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা ইতিবাচক সাড়া পাচ্ছি।
এইচএসসি পরীক্ষার সেশনজট প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এ সমস্যার সমাধানে শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দুই বছরের কোর্স নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যেই সব পরীক্ষা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। জানুয়ারি থেকে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু করতে চাই, যাতে কোনো ধরনের অপেক্ষার সময় না থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও যেন দ্রুত ভর্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে, সে বিষয়ে সমন্বিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। আমরা চাই, আমাদের কারণে কোনো শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত না হোক। সচেতনতা ছাড়া গুজব প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। গুজব প্রতিরোধ ও সুষ্ঠু পরীক্ষা পরিচালনায় সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখ এসএসসি ও সমমান এবং ২০ লাখ এইচএসসি ও সমমানের শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষার দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে মূল্যবান সময় হারাচ্ছে। শুধু ভর্তি পরীক্ষার কারণেই জাতির কাছ থেকে প্রায় ৪০ লাখ বছর সময় নষ্ট হচ্ছে। কখন ভর্তি শুরু হবে এবং কখন শেষ হবে– এই বিষয়গুলো সমন্বয়ের দায়িত্ব কি সংশ্লিষ্ট সবার নয়? এসএসসি ও এইচএসসি উত্তীর্ণ বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি প্রক্রিয়ার জটিলতায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকছে, যা দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডকে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি কাটাতে দ্রুত একটি সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শুধু কারিকুলাম বা সিলেবাস শেষ করলেই হবে না কীভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকে উন্নত করা যায়, সে ভাবনা সবার মধ্যে থাকতে হবে। দেশের উন্নয়নে বর্তমান সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত রাখতে হবে। তবে শুধু সরকারের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বরং শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সবাইকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষার মান উন্নয়নের কেন্দ্র হবে নাকি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে এ বিষয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশনার প্রয়োজন। আমরা কি সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত মানবসম্পদ তৈরি করছি, নাকি শুধু ডিগ্রি দিচ্ছি এই প্রশ্ন আমাদের সামনে রয়েছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শুধু নতুন বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন নয়, এগুলোকে গবেষণার উৎকর্ষ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উন্নত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ‘বেকারত্বের কারখানা’ বানানো যাবে না। এর পরিবর্তে সেগুলোকে কর্মসংস্থানমুখী ও গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। এক্ষেত্রে শিল্প-অ্যাকাডেমিয়া সংযোগ জোরদারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে ঘাটতি রয়েছে। অ্যাক্রেডিটেশন কাউন্সিলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম নিয়েও তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
—এজেড