ঢাকা, বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ২ বৈশাখ ১৪৩৩ | ২৬ শাওয়াল ১৪৪৭

শিরোনাম

চতুর্থ বছরে গৃহযুদ্ধ, বহু নিহত-বাস্তুচ্যুত আর তীব্র খাদ্য সংকটে বিপর্যস্ত সুদান

চতুর্থ বছরে গৃহযুদ্ধ, বহু নিহত-বাস্তুচ্যুত আর তীব্র খাদ্য সংকটে বিপর্যস্ত সুদান

তিন বছর পেরিয়ে চতুর্থ বছরে প্রবেশ করেছে আফ্রিকার দেশ সুদানের গৃহযুদ্ধ। এই সময়ে দেশটিতে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১ লাখ ৫০ হাজার। বর্তমানে মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় রয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষের এবং তীব্র খাদ্য সংকটে ২ কোটি ১০ লাখ মানুষ ভুগছে।

২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল শুরু হওয়া এই সংঘাতে একদিকে রয়েছে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী-এসএএফ, যার নেতৃত্বে আছেন আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান, অন্যদিকে রয়েছে আধাসামরিক বাহিনী র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স-আরএসএফ, যার নেতৃত্বে আছেন হেমেদতি নামে খ্যাত মোহাম্মদ হামদান দাগালো। বহুবার আন্তর্জাতিকভাবে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি আলোচনার চেষ্টা হলেও সহিংসতা বন্ধে এখনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। সুদানের ১৮টি রাজ্যের মধ্যে পশ্চিম দারফুর অঞ্চলের পাঁচটি রাজ্যই নিয়ন্ত্রণ করে আরএসএফ। শুধুমাত্র উত্তর দারফুরের কিছু অংশ ছাড়া তাদের হাতে নেই। ওই অংশ দেশটির সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এছাড়া দেশটির দক্ষিণ, উত্তর, পূর্ব ও মধ্যভাগের অবশিষ্ট ১৩টি রাজ্যের বেশিরভাগ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে সেনাবাহিনী, যার মধ্যে রাজধানী খার্তুমও রয়েছে।

সুদানে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার প্রতিনিধি মারি-হেলেন ভার্নি সাংবাদিকদের জানান, প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এদের মধ্যে ৯০ লাখ মানুষ সুদানের অভ্যন্তরে এবং ৪৪ লাখ মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে চাদ, দক্ষিণ সুদান ও মিশরে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় রয়েছেন। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা কোনো সমাধানের দিকে সুস্পষ্ট অগ্রগতি দেখতে পাচ্ছি না। একটি বিষয় লক্ষণীয় যে, বিমান হামলা এবং ড্রোন আক্রমণের ব্যবহার বেড়েছে।

২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ড্রোন হামলায় কমপক্ষে ৬৯৯ জন বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যুর ঘটনা নথিভুক্ত করেছে, যা এই তিন মাসে মোট বেসামরিক মৃত্যুর ৭৫ শতাংশেরও বেশি। ইউনিসেফের তথ্যমতে, দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৩ কোটি ৩৭ লাখ মানুষের এখন মানবিক সহায়তা প্রয়োজন, যার মধ্যে ১ কোটি ৭৩ লাখ শিশু রয়েছে। লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতাও একটি দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। ইউনিসেফ বলেছে, অপরাধীরা প্রধানত নারীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে, তবে পুরুষ ও ছেলেরাও এ থেকে রেহাই পায়নি।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে শিশুরা অন্যতম। সুদানের জনসংখ্যার ৪১ শতাংশের বয়স ১৫ বছরের কম হওয়ায়, তারা চরম ঝুঁকির সম্মুখীন। এসব ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে যৌন সহিংসতা, সশস্ত্র গোষ্ঠী দ্বারা জোরপূর্বক নিয়োগ এবং শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশব্যাপী ১৯ হাজার ৮৮৩টি স্কুলের মধ্যে মাত্র ১২ হাজার ২৪৩টি চালু রয়েছে, যা মোট স্কুলের ৬২ শতাংশ। উত্তর দারফুর, দক্ষিণ দারফুর, পশ্চিম কর্দোফান এবং পশ্চিম দারফুরে স্কুল বন্ধের পরিস্থিতি সবচেয়ে তীব্র, যেখানে প্রতি তিনটি স্কুলের মধ্যে একটিরও কম খোলা রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাস্তুচ্যুত হওয়া লাখ লাখ মানুষ ছাড়াও, ২১ মিলিয়ন সুদানি এখন তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার সম্মুখীন, যার মধ্যে ৬.৩ মিলিয়ন মানুষ সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্যের অভাবে রয়েছে। নেক সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে স্থবির হয়ে পড়েছে কৃষিকাজ। গবাদি পশু লুট হয়ে গেছে এবং বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলো প্রায়শই ফসল বা বাজারে প্রবেশাধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

বহু ক্লিনিক ধ্বংস হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগও। দেশের ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষের জরুরি স্বাস্থ্য সহায়তা প্রয়োজন। হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে এবং রোগের প্রাদুর্ভাব ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ৩৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্র অকার্যকর এবং মাত্র ৬৩ শতাংশ অন্তত আংশিকভাবে কার্যকর রয়েছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির তথ্যমতে, গত বছর সুদান তার সবচেয়ে ভয়াবহ কলেরার প্রাদুর্ভাবে আড়াই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় এবং দেশজুড়ে ১ লাখেরও বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়।

—এজেড