ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | ১৬ বৈশাখ ১৪৩৩ | ১২ জ্বিলকদ ১৪৪৭

শিরোনাম

মিডল ইস্ট আইয়ের বিশ্লেষণ

‘সুনিশ্চিত ব্যর্থতা’ জেনেই লেবাননে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ইসরায়েলের

‘সুনিশ্চিত ব্যর্থতা’ জেনেই লেবাননে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা ইসরায়েলের

লেবাননে সামরিক সাফল্য পাচ্ছে না দখলদার ইসরায়েল। তাই এখন বেসামরিক মানুষের উপর ব্যাপক হামলার পথ বেছে নিয়েছে তারা। গতকাল ৮ এপ্রিল মার্কিন-ইরান যুদ্ধবিরতির ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান লেবাননে নজিরবিহীন হামলা চালায়। মাত্র দশ মিনিটের মধ্যে প্রায় ১০০টি বিমান হামলা হয়। বৈরুতের মিশ্র জনগোষ্ঠীর এলাকা এবং সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায়ও হামলা হয়েছে। ৬ এপ্রিল বৈরুতের উপকণ্ঠে আইন সাদেহতে খ্রিস্টান লেবানিজ ফোর্সেসের শীর্ষ নেতা পিয়েরে মুয়াওয়াদ ও তার স্ত্রীকে হত্যা করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হিজবুল্লাহ ও অন্যান্য লেবানিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করাই ইসরায়েলের লক্ষ্য।

কিন্তু এই হামলার মধ্যেও সবচেয়ে বড় চমক দিচ্ছে হিজবুল্লাহ। ২০২৪ সালের যুদ্ধে পরাজিত ভেবে যে সংগঠনকে ইতিহাসের পাতায় ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে তারা ফিরে এসেছে। আগের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর প্রায় চার হাজার যোদ্ধা নিহত হয়েছিলেন। শীর্ষ নেতৃত্ব হত্যা করা হয়েছিল। ২৭ নভেম্বর ২০২৪-এর যুদ্ধবিরতির পর ১৫ মাস তারা চুপ ছিল। এই সময়ে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ইসরায়েল ১০ হাজার বার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে এবং হিজবুল্লাহর প্রায় ৪০০ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাই সবাই মনে করেছিল সংগঠনটি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে না। কিন্তু ২ মার্চ হিজবুল্লাহ লেবানন ফ্রন্ট খুলে দেওয়ার পর সব হিসাব পাল্টে গেছে।

অবসরপ্রাপ্ত লেবানিজ জেনারেল এলিয়াস ফারহাত বলেছেন, এটা স্পষ্ট যে হিজবুল্লাহ তার সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠন করেছে। ইসরায়েলি উত্তরাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধান মেজর জেনারেল রাফি মিলো নিজেও স্বীকার করেছেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী হিজবুল্লাহর এই পুনর্গঠনের ক্ষমতায় ‘অবাক’ হয়ে গেছে। ২ থেকে ৩০ মার্চের মধ্যে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে পাঁচ হাজারেরও বেশি রকেট, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। ২৬ মার্চ একটি দিনেই ৬০০-রও বেশি প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করা হয়েছে।

কাতারের আল-আরাবি আল-জাদিদ চ্যানেল জানিয়েছে, ইসরায়েলি হিসাব অনুযায়ী হিজবুল্লাহ পাঁচ মাস পর্যন্ত প্রতিদিন ২০০টি রকেট ও ড্রোন ছোড়ার ক্ষমতা রাখে। দক্ষিণ লেবানন ফ্রন্টে ইসরায়েলের ক্ষতিও উল্লেখযোগ্য। এখন পর্যন্ত ১১ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত ও ৩০০-রও বেশি আহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহর দাবি, তারা ১৩৬টি মার্কাভা ট্যাংক ও ২৬টি সামরিক যান ধ্বংস করেছে। পাঁচটি ডিভিশন ও বেশ কয়েকটি এলিট রেজিমেন্ট নিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় অভিযান চালিয়ে ইসরায়েল মাত্র ২০৮ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ন্ত্রণে নিতে পেরেছে। এটি লেবাননের মোট ভূখণ্ডের মাত্র দুই শতাংশ।

ইসরায়েলের গোয়েন্দা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে হিজবুল্লাহ এখন হাতে লেখা নোট ও মানব বার্তাবাহক ব্যবহার করছে। এ কারণেই ব্যাপক বিমান হামলার পরেও ইসরায়েল নতুন নেতৃত্বকে চিহ্নিত করে হত্যা করতে পারছে না। হিজবুল্লাহ বিশেষজ্ঞ আমাল সাদ এই রণকৌশলকে ‘মুগনিয়েহ মডেলে’ ফিরে যাওয়া বলে বর্ণনা করেছেন। ছোট দলে বিভক্ত, গেরিলা কায়দায় চলমান এবং অতর্কিত হামলার এই কৌশল ২০০৬ সালের যুদ্ধেও ব্যবহার করা হয়েছিল। এমনকি মার্কিন সামরিক ম্যানুয়ালেও এই মডেল নিয়ে আলোচনা রয়েছে।

অস্ত্রের দিক থেকেও হিজবুল্লাহ নতুন সক্ষমতা দেখাচ্ছে। ইরানি আলমাস ২ ও ৩ ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। ১৮ মার্চ সীমান্ত থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরে আশকেলনে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করা হয়েছে। ৬ এপ্রিল লেবানিজ উপকূলে একটি ইসরায়েলি নৌযানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিও করেছে। সূত্র জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর প্রায় ৩৫ হাজার সক্রিয় যোদ্ধা আছেন এবং আরও ৫০ হাজার রিজার্ভ যোদ্ধা আছেন অপেক্ষায়। গত ডিসেম্বরে সামরিক কমান্ডাররা মহাসচিব নাইম কাসেমকে জানিয়েছিলেন, পুনর্গঠনের কাজ শেষ এবং ‘প্রতিরোধ নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুত।’ তখন অনেকে এটাকে প্রচারণা ভেবেছিলেন। রণক্ষেত্রের বাস্তবতা এখন বলছে, সেটা মোটেও প্রচারণা ছিল না।

—এজেড